কলকাতার অলিগলিতে শরতের হাওয়া যখন শিউলির গন্ধ বয়ে আনে, ঢাকের আওয়াজে যখন শহরের হৃদয় জেগে ওঠে, তখন রাজেন্দ্রলাল স্ট্রিটও সেজে ওঠে তার চিরচেনা উৎসবের সাজে। সেই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আট দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতি, আবেগ, ঐতিহ্য এবং অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।
১৯৪৩ সালে যে শুভ পথচলার সূচনা, ২০২৬-এ তা পূর্ণ করেছে গৌরবময় ৮৩ বছর। এই দীর্ঘ পথচলা শুধুমাত্র একটি দুর্গাপুজোর ইতিহাস নয়; এটি একাধিক প্রজন্মের একসঙ্গে বেড়ে ওঠার ইতিহাস। পুরনো দিনের স্মৃতি থেকে আজকের আধুনিক সময় — প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মা দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক নিবিড় সামাজিক বন্ধন।
সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, উৎসবের আয়োজনের ধরন বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি মা দুর্গার প্রতি বিশ্বাস, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং একসঙ্গে পথ চলার সেই চিরন্তন মানসিকতা।
আমাদের কাছে দুর্গোৎসব মানে শুধুমাত্র চার দিনের আনন্দ নয়। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোও আমাদের দায়িত্ব। সেই ভাবনা থেকেই বছরের পর বছর ধরে রক্তদান শিবির আয়োজন এবং দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের মধ্যে শাল ও বস্ত্র বিতরণের মতো সমাজসেবামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে কমিটি। কারণ, মা দুর্গার আরাধনার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হয় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যেই।
এই ৮৩ বছরের পথচলায় যাঁরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের পাশে থেকেছেন — কমিটির প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যবৃন্দ, স্থানীয় বাসিন্দা, শুভানুধ্যায়ী, দাতা, স্বেচ্ছাসেবক এবং অসংখ্য ভক্ত — তাঁদের সকলের অবদানেই আজকের এই ঐতিহ্য।
রাজেন্দ্রলাল স্ট্রিটের দুর্গোৎসব তাই শুধুই একটি পুজো নয় — এ এক উত্তরাধিকার। যে উত্তরাধিকার প্রজন্মের হাত ধরে প্রজন্মে পৌঁছে যায়। যে উত্তরাধিকার আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। যে উত্তরাধিকার শেখায় — উৎসব তখনই সার্থক, যখন তার আনন্দ সবার।
আজ ৮৩ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আমাদের একটাই প্রার্থনা — মায়ের আশীর্বাদে অটুট থাকুক আমাদের ঐক্য, অক্ষুণ্ণ থাকুক আমাদের ঐতিহ্য, আর মানুষের পাশে থাকার এই অঙ্গীকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলুক। মা আসেন প্রতি শরতে, আর সঙ্গে নিয়ে আসেন ভালোবাসা, শক্তি ও একতার বার্তা। জয় মা দুর্গা। শুভ শারদীয়া।